
শিলিগুড়ি, ৪ নভেম্বর:
শিলিগুড়ির হাতিমোড়ে রিচা ঘোষের বাড়িতে ঢুকলেই প্রথমেই চোখে পড়বে ভাঙা জানালার কাচ। অনেকে প্রথমে ভাবেন, বোধহয় কোনো দুর্ঘটনা বা হামলা ঘটেছে! কিন্তু না—এই ভাঙা কাচই আসলে রিচার ক্রিকেট–জীবনের নীরব সাক্ষী। ছোটবেলায় ব্যাট হাতে একের পর এক জোরালো শট মেরে বল জানালায় আছড়ে ফেলত ছোট্ট রিচা। প্রতিটি ভাঙা কাচ যেন হয়ে উঠেছিল এক একটি স্বপ্নের জানালা, যার ওপারে অপেক্ষা করছিল বিশ্বজয়ের আলো।
রিচার বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ নিজেও ছিলেন ক্রিকেটার। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর, কিন্তু সেই অপূর্ণ স্বপ্নই মেয়ের মধ্যে বুনেছিলেন তিনি। সংসারের তাগিদে রেস্তোরাঁ চালানো ছেড়ে মেয়েকে সময় দিয়েছেন ক্রিকেট শেখাতে। এখন তিনি সিএবি স্বীকৃত আম্পায়ার।
চার বছর বয়সে ক্লাবে ভর্তি হয় রিচা। প্রথমে টেবিল টেনিসে নাম লিখিয়েছিল, কিন্তু বেশি দিন নয়—বল–ব্যাটের টানেই চলে আসে ক্রিকেটে। ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে অনুশীলন করত, কখনও ভয় পায়নি।
মানবেন্দ্র ঘোষ স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“ও ছোট থেকেই খুব চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসত। আমি যত দূরে বল মারতাম, ও চাইত আরও দূরে মারতে। সেই জেদই আজ ওকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।”
মাত্র আট বছর বয়সেই রিচা পৌঁছে যায় ইডেন গার্ডেন্সে বাংলার অনূর্ধ্ব–১৯ ট্রায়ালে। তারপর কল্যাণীর শিবির, অনূর্ধ্ব–২৩, সিনিয়র বাংলা দল—সব ধাপ পেরিয়ে আজ ভারতের জার্সিতে গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে সে।
রবিবার নবি মুম্বইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫২ রানে হারিয়ে ভারতীয় মহিলা দল প্রথমবারের মতো ওয়ান ডে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে রিচার ব্যাটে ঝলমলে ইনিংস যেন গোটা দেশকে আলোয় ভরিয়ে দেয়।
গর্বে আপ্লুত বাবা মানবেন্দ্র বললেন,
“কাল সারারাত ঘুমোইনি। আমার স্বপ্নটা পূরণ হয়ে গেছে। মেয়ের জন্য এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে!”
তিনি আরও বলেন,
“রিচা মানসিকভাবে খুব শক্ত মেয়ে। আমি ভয় পেতাম, কিন্তু ও জানত কী করতে হবে। আজ বুঝতে পারছি, ওর ভিতর কতটা সাহস।”
আজ শিলিগুড়ি জুড়ে আনন্দের হাওয়া। সেই শহর, যেখানে একদিন এক ছোট মেয়ে জানালার কাচ ভাঙত ক্রিকেট বলের আঘাতে—আজ সেই মেয়েই বিশ্বজয়ের গল্প লিখেছে ভারতের জন্য।